Anindita Mitra

গল্প

অনিন্দিতা মিত্র

কাল এয়ারপোর্ট থেকে হোটেলে এসেছি প্রায় রাত একটা নাগাদ। রুমে ঢোকার খানিকক্ষণের মধ্যেই প্রবেশ করেছিলাম ঘুমের পৃথিবীতে, অসহনীয় ক্লান্তি আমাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছিল। অঘোরে অনেকটা সময় ঘুমোনোর পর উঠলাম এই এখন। পর্দা সরাতেই ঝিলিমিলি রোদ্দুর উষ্ণতা ছড়িয়ে দিল ঘর, দুয়ার, ট্রলি ও হোটেলের আসবাবপত্রে। খানিকটা সময় আনমনে বসে রইলাম জানলার পাশে। যতটা দেখতে পাচ্ছি শুধুই সবুজ আর সবুজ। সবুজের বিস্তীর্ণ প্রান্তরে উপরে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে অজস্র গাছ। সবুজের সমারোহের মধ্যে একটা গোল চাকতির মতো গোলাপ বাগান দেখতে বেশ লাগছে। মনে হচ্ছে সবুজ বালাপোশের মাঝে কেউ রঙিন সিল্কের সুতো দিয়ে সুচের ফুলকারি কাজ করেছে। দুজন মালিভাই গাছের পরিচর্যা করতে ব্যস্ত। এই প্রসঙ্গে নিজের পরিচয় পর্বটা সেরে নিই।  আমি অনামিকা দে, পেশায় একজন  সঙ্গীতশিল্পী ও শিক্ষক। দিল্লীর চিত্তরঞ্জন পার্কে আজ বিকেলে আমার গানের একক অনুষ্ঠান আছে। এখান থেকেই চলে যাবো মুম্বাইতে একটা গান রেকর্ড করতে, ওখানে দুদিন থেকে ফিরে যাবো আমার বাড়ি উত্তরপাড়ায়। ঘড়ি বলছে পৌনে আটটা বাজে। ভাবলাম নাহ্, বসে থাকলে আর চলবে না। ফ্রেশ হয়ে আসতেই কলিং বেলের শব্দ শুনলাম। দরজা খুলতেই একজন সহাস্য মুখে বললেন, “গুড মর্নিং ম্যাডাম। তলার লনে ব্রেকফাস্ট করতে পারেন, আর আপনি চাইলে ঘরেও দিতে পারি। “ আজকের দিনটা একটা রোদ ঝলমলে ঝকঝকে দিন। তাই ভাবলাম নীচেই যাই। ওই স্টাফকে বললাম “ ঘরে দিতে হবে না, আমি যাচ্ছি।” লোকটি চলে যেতেই একটা স্কার্ফ জড়িয়ে চললাম লনে। এখন হেমন্তলক্ষ্মী যাই যাই করছে। সন্ন্যাসীর বেশে কুয়াশার জটা ধারণ করে শীত আসতে চলেছে। গাছেরা তৈরি হচ্ছে পাতা খসিয়ে আরো আরো একা হওয়ার জন্য। ওই যে কোন ছোটবেলায় পড়েছিলাম,” আমলকী -বন কাঁপে যেন তার/ বুক করে দুরু দুরু-/ পেয়েছে খবর পাতা- খসানোর/ সময় হয়েছে শুরু।”

 সত্যিই হোটেলের লনটা খুব সুন্দর আর নান্দনিক। বেশ কিছু সুসজ্জিত চেয়ার টেবিল পাতা আছে। টেবিলে গিয়ে বসতেই খাবার এসে গেল। ফোনের টুকটাক মেসেজ দেখতেই চোখে সামনে ভেসে উঠলো আমার ছাত্রী মেঘনার টেক্সট। “ ম্যাডাম, আপনি দিল্লিতে এসেছেন তো? আমি একটু বেলায় আসছি দেখা করতে।” আমার ছাত্রছাত্রীরা ছড়িয়ে আছে দেশ বিদেশের নানা জায়গায়। মেঘনা আমার গানের স্কুল “ বলাকা” র একেবারে প্রথম ব্যাচের ছাত্রী। মেঘনা এখন কর্মসূত্রে এখানে আছে। আরো কয়েকজনের মেসেজের উত্তর দিতে দিতে কখন যে খাওয়া শেষ হয়ে গেছে বুঝতেই পারিনি। চেয়ার ছেড়ে উঠবো উঠবো করছি এমন সময় হঠাৎ একজন লোককে  ব্যাডমিন্টনের ব্যাট হাতে আর কোলে বাচ্চা নিয়ে হাসতে হাসতে এগিয়ে আসতে দেখলাম। লোকটা এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে আমার স্মৃতি। মনে মনে বললাম সাগর তো! পাছে মুখোমুখি না হতে হয় তাই তাড়াতাড়ি উঠে ঘরের দিকে এগিয়ে চললাম। হঠাৎই যেন চলার ছন্দটা সাগরকে দেখে থমকে গেল। যে অতীত আমাকে হতাশা, দুঃখের অতলে তলিয়ে দেয় আমি মনে করি তা না খোঁড়াই ভালো। তবুও স্মৃতি হৃদয়ের সরোবরে মাঝে মাঝে ভেসে ওঠে মরসুমী ফুলের মতো। একেবারে এড়িয়ে যাই কেমন করে! সাময়িক উত্তেজনায় ঘাম ঝরছে, ওয়াশরুমে গিয়ে চোখে মুখে জল দিলাম। মুখ গলায় অ্যাসিডে পোড়া দাগগুলোর দিকে ভালো করে তাকালাম। মাঝে মাঝে আমি দাগগুলো দেখি মনের জোর পাওয়ার জন্য। এই দাগগুলো আমাকে নতুন নতুন শিক্ষা দেয়। তবে এখন দেখছি অতীতের ভয়াবহ দিনগুলো পিছু ডাকছে বলে। চোখের কোণটা বুকফাটা যন্ত্রণায় জ্বালা জ্বালা করছে। জলের ধারা নেমে এলো বলে…

দুই

আমি তখন রবীন্দ্রভারতীতে গান নিয়ে এম.এ পড়ছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের দোলের অনুষ্ঠানে সাগরের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেয় আমার বন্ধু অনীক। পেশায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হলেও গান, সাহিত্য এইসব কিছুর প্রতি সাগরের অগাধ অনুরাগ ছিল। নিজেও গান গাইতো, কবিতা পড়ত দেখা হলেই। প্রথম আলাপের পর আস্তে আস্তে আমরা ক্রমশ কথা বলতে শুরু করি। সাগর আমার ক্লাস শেষ হওয়ার সময়ে প্রায়শই ইউনিভার্সিটি আসত। দুজনে মিলে অনেকটা সময় এখানে ওখানে গল্প করতাম। ভালোলাগার ধারা ক্রমশ প্রেমের জলপ্রপাতের রূপ নেয়। আমি এম.এ পাশ করে যখন রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে পিএইচডি করতে শুরু করি তখন দুজনে একসঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত নিই। দুই বাড়ির কথাবার্তায় বিয়ের দিন ঠিক হয়ে যায়। আমার জীবনের চরমতম দুর্যোগ ঘনিয়ে আসে বিয়ের কয়েকদিন আগে। আমি আর পাড়ার ছোটবেলার বন্ধু সুজাতা মার্কেটিং করে ফিরছিলাম। সুজাতা বেশ কিছুদিন আগে থেকেই একটু সমস্যায় ছিল। স্থানীয় কিছু দুস্কৃতি সুজাতাকে মাঝে মাঝেই বিরক্ত করত। রাস্তায় বেরোলেই অশালীন মন্তব্য শোনাত। বাইক নিয়ে রাস্তা আটকানোর চেষ্টাও করেছিল। এই নিয়ে সুজাতার বাড়ির লোকজনের পক্ষ থানায় জানানো হয়েছিল। সেই রাতে ওরা সুজাতাকে টার্গেট করে অ্যাসিড ছোঁড়ে। সুজাতা আঘাতের হাত থেকে বেঁচে গেলেও আমি রেহাই পাইনি। আমার মুখ ও গলায় অ্যাসিড লাগে। প্রথমে জলের মতো কিছু একটা পড়েছে মনে করতে করতেই অসহ্য জ্বলন অনুভব করি। আমাকে পাড়ার লোকজন হসপিটালে নিয়ে যায়। কদিন পর চোখ খুলে তাকিয়ে বাড়ির লোকজনের সঙ্গে সাগরকে খুঁজেছিলাম। বাবা বলেছিল,  ”আগে বাড়ি চল, সব বলবো।” মৃত্যুর সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করে বাড়ি ফিরি। বাড়ি এসে শুনি সাগর খবর পেয়েও একদিনের জন্য দেখতে আসেনি। সাগরের বাড়ি থেকে জানিয়ে দেয়,” এ বিয়ে সম্ভব নয়।”।  পোড়ার প্রদাহ, সম্পর্কের বিচ্ছেদ সবকিছু নিয়ে অনেক দিন তীব্র কষ্টে ভুগেছি। ওই কঠিন সময়ে কখন যে দিন থেকে রাত হয়েছে বুঝিনি। এতটাই ট্রমার মধ্যে ছিলাম যে আয়নায় নিজের মুখ দেখলেই চিৎকার করে কাঁদতাম। সময় এগোতে থাকে নিজের নিয়মে। বাবা মা একটাই কথা তখন বলে যেত- “ সব ছেড়ে গেলেও সুর তোকে জড়িয়ে থাকবে।” বাড়ির লোকজন, বন্ধুবান্ধব, শিক্ষকদের সাহায্যে জীবনে ফিরি, আবার সুরের হাত ধরি। কোর্টে মামলা চলে, আমার আর সুজাতার যৌথ জবানবন্দিতে অপরাধীরা শাস্তি পায়। তারপর পিএইচডি শেষ করি এবং গানের স্কুল “বলাকা”র যাত্রাপথ শুরু হয়। এক সময় আমি নিজেও উপলব্ধি করি ওই বিয়ে না হয়ে ভালোই হয়েছে। জীবনের অন্য কোনো বিপদে একসঙ্গে একই ছাদের তলায় থাকলেও হয়তো সাগরকে পেতাম না। সাগর শঙ্খ ঘোষের  “ সঙ্গিনী” কবিতাটা খুব বলতো। “ হাতের উপর হাত রাখা খুব সহজ নয়/ সারা জীবন বইতে পারা সহজ নয়/ এ কথা খুব সহজ, কিন্তু কে না জানে/ সহজ কথা ঠিক ততটা সহজ নয়।” একটা মানুষের মধ্যে যে কতগুলো চরিত্রের মানুষ বাস করে ঠিক সময় না আসলে আমরা বুঝতেই পারি না। আবার না বুঝতে পেরে অনেক মানুষের হয়তো জীবনটাই কেটে যায়। হঠাৎই বুঝলাম ফোনটা বাজছে, দেখলাম বাবার অনেকগুলো মিসডকল। ঘুরিয়ে করতেই শুনলাম,” তোকে কখন থেকে ফোন করছি, তুই কোনো খবর পাসনি!” আমি হকচকিয়ে বললাম,” কোন খবর?” “ তুই ইন্দিরা দেবী সঙ্গীত পুরস্কার পেয়েছিস, তুই সত্যি শুনিসনি?!” ফোনটা উত্তর দেওয়ার আগেই কেটে গেল। বুকের ভেতরটা ধুকপুক করছে, একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে যেটা প্রকাশ করতে পারছি না। কয়েক মিনিটের মধ্যেই অজস্র ফোন আসতে শুরু করে দিল। আবার বেল বেজে উঠলো। ঘরের বাইরে যেতেই আগের স্টাফই বললেন, “ ম্যাডাম, একজন আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন।” ওহ্ মেঘনা আসার সময় হয়ে গেছে যে! ধড়ফড় করে চুল আঁচড়াতে গিয়ে চোখ গেল জানলার কার্নিশ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা মাধবীলতা গাছটার দিকে। সেখানে একটা পাখির বাসা দেখলাম। মা ময়না পাখিটা চুপটি করে বসে আছে। দুটো ছানা কে জানে কোন সুদূরে পাড়ি দিল বাসা থেকে, উড়তে শিখে গেছে। সময় থেমে থাকে না।

রোদটা ক্রমশ বাড়ছে। নাকে আসছে ফুলদানিতে সাজিয়ে রাখা কোনো ফুলের মিষ্টি গন্ধ।

চললাম নীচে, মেঘনা বসে আছে যে!

Scroll to Top