Anindita Mitra

গল্প

অনিন্দিতা মিত্র

নাইনইভেন পরিচালিত ইন্টারন্যাশানাল্ শর্টফিল্ম ফেস্ট ২০১৭-তে ফিল্মোপযোগী গল্প প্রতিযোগিতায় স্মারক ও স্বীকৃতি প্রাপ্ত।

বসন্তের বিকেল। আকাশটা আশমানি রঙের বেনারসী পরে যেন কনে সেজেছে। ঝিলের দু’ধারে ফুলে ফুলে ছেয়ে আছে। একফুল থেকে অন্যফুলে পাড়ি দিচ্ছে ভ্রমরের দল। হালকা বাতাসে তিরতির করে কাঁপছে গাছের পাতাগুলো। কোথা থেকে একটা ডাহুক পাখি ছুটে এসে ঝুপ করে ডুব দিল ঝিলের জলে। স্কুল থেকে এই পথটা দিয়ে বরাবর ফিরতে পছন্দ করে আনন্দী। কলকাতার ইট পাথরের ভিড়ে কোথাও যেন প্রকৃতিকে এখানে অনুভব করা যায়। জীবনের বত্রিশটা বসন্ত, কাটিয়েছে আনন্দী। মাঝামাঝি উচ্চতা, ফর্সা, টানা চোখ, কোমর অব্দি চুল আছে তার। শাড়ি পরে আর বিনুনি দুলিয়ে যখন সে হাঁটে তার দিকে চোখ পড়তে পথিকের বাধ্য। আজ সে পরেছে বাসন্তী আর লাল রঙের একটা তাঁতের শাড়ি। দারুণ লাগছে। মেধা আর আত্মিক সৌন্দর্যের একটা প্রচ্ছন্ন আভা ছড়িয়ে পড়েছে মুখময়। একটু বেঞ্চিতে বসেই উঠে পড়ল আনন্দী। গানের ছাত্রীরা আসবে। গেটটা খুলে বাড়িতে ঢুকতেই সে দেখল ছাত্রীরা হাজির। ব্যাগটা রাখতেই কানে এল কার গলা, ‘তিথি, আজ এত দেরি কেন রে? সোমাশ্রীরা এসে গেছে।’

চুলটাকে খোঁপা বেঁধে নিয়ে তিথি উত্তর দিল ‘মা জানি গো। ওদের বলে দাও যাচ্ছি। এককাপ চা দেবে প্লিজ।

‘ম্যাডাম একটু রেস্ট নিন। আমরা বসে আছি। এই এলেন। আমি ঠিক আছি। তোমরা শুরু করতে পারো’।

কয়েকটা মিনিট যেতে না যেতেই আবার তিথির কানে এল মার গলা। তিথি ফোনটা বাজছে। থাক মা আমি রিং ব্যাক করে নেব। ছাত্রীদের নিয়ে গানের সাগরে পাড়ি দিল আনন্দী।

ছাত্রীরা যখন বাড়ি গেল তখন বাজে ছ’টা। সন্ধ্যা প্রায় এসে গেছে। ফোনটা হাতে নিয়ে ছাতে গিয়ে দেখল আনন্দী বিপিনদার ছটা মিসড্ কল।

সে ফোন করল। বিপিনদাকে।

বিপিনদার সঙ্গে আনন্দীর সেই কলেজ থেকে চেনা। ওপার থেকে বিপিনদা বলতে লাগল, ‘কিরে কোথায় ছিলি? কতবার ফোন করলাম। আনন্দী বলল, ‘গান শিখতে ছাত্রীরা এসেছিল। বলো’। ‘তোর জন্য শুধু কেন বলি আমাদের জন্য একটা দারুন সুসংবাদ আছে। দেবজ্যোতি আর কিছুদিন পরেই জেল থেকে ছাড়া পাচ্ছে’।

আনন্দী কথাটা শুনে নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারল না। ফোনটা কেটে যেতেই স্মৃতির অন্দর মহলে প্রবেশ করল সে।

উত্তর কলকাতার বর্ধিষ্ণু পরিবারের মেয়ে আনন্দী। পড়াশোনার পাশাপাশি গানের প্রতি ছোট থেকেই তার খুব ঝোঁক আছে। সবার উৎসাহে গানটাও সে খুব ভালো গায়। উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর বাংলায় অর্নাস নিয়ে বিদ্যাসাগর কলেজে ভর্তি হয় আনন্দী। কিছু মাস পর কলেজে র স্যোশালের প্রোগ্রামের রিহার্সালের সময় আলাপ হয় দেবজ্যোতির সঙ্গে। আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে পরিচয়। উত্তরবঙ্গের ছেলে দেবজ্যোতি ও বাংলার ছাত্র। দরাজ গানের গলার জন্য বন্ধুমহলে তার সবিশেষ খ্যাতি আছে।

সেই দিনটা আনন্দীর আজও মনে আছে। একদিন প্রবল বৃষ্টি হচ্ছিল। ছাতা না নেওয়ায় ক্লাসের পর ঠায় সে দাড়িয়ে ছিল। তারপর দেবজ্যোতির সাথে তার ছাতায় সে ফিরতে বাধ্য হয়। তখন অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ছে।

হেদুয়ায় পার্কের কাছে পৌঁছে দেবজ্যোতি বলল ‘একটু দাঁড়িয়ে যায় বুঝলি’ ফাঁকা শুনশান পার্ক। ভিজে কাকগুলো গাছের ডালে বসে আছে।

দেবজ্যোতি গাইল, – ‘এমন দিনে তারে বলা যায় / এমন ঘন ঘোর বরিষায়’।

কফি হাউসে দু’জনের এক সঙ্গে বসে চলত পড়ার আলোচনা। কফির ধোঁয়া আর বাসনের টুংটাং আওয়াজের সঙ্গে দু’জনের মনের গহীনে বেজে উঠেছিল প্রেমের রিনিঝিনি সুর। কলেজ শেষ করে দু’জনেই যায় বিশ্ব বিদ্যালয়ে। সরস্বতী পুজোর একটা দিনের স্মৃতির প্রতিধ্বনি হৃদয়ের গহ্বরে কান পাতলে আনন্দী এখনও শুনতে পায়। সেদিন দু’জনে বিকেলে বেড়াতে গেল নলবনে। গাছের তলায় বসে ছিল দু’জনে। আনন্দীর হাতের ওপর ছিল দেবজ্যোতির হাত। দু’জনের চোখে ছিল রঙীন আদুরে স্বপ্ন। সেই বিকেলেই আনন্দীর মাথা নিজের বুকে রেখে দেবজ্যোতি বলেছিল, ‘সারা জীবন এমনিই থাকিস’। দূরে দুটো বেনে বউ পাখি একে অপরের ঠোঁটে ঠোঁট রেখে বলছিল ভালোবাসার কথা। প্রেম বড়ই অদ্ভুত। তার বিপুল অকস্মাৎ তরঙ্গ কখন যে কাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় কেউ জানে না। দু’জনে মিলে ঠিক করেছিল এম.এ. পাশের পর চাকুরী করে বিয়ে করবে। পৃথিবীতে এমন কিছু ঘটনা ঘটে যা আমাদের কাছে কল্পনারও বাইরে। বাড়ি দূরে হবার জন্য দেবজ্যোতি ছিল কলকাতার মেসে। হঠাৎ একটা কালো ঝড় এল দু’জনের জীবনে। বিপিনদাও নর্থ বেঙ্গল থেকে এসে কলকাতার মেসে থাকত দেবজ্যোতির পাশের ঘরে। দেবজ্যোতির রুমমেট অমল কিছু সমাজবিরোধীমূলক কাজকর্মে জড়িয়ে পড়ে। অমলের সঙ্গে তার বন্ধুর তীব্র বচসা হয়। সেইসময় উপস্থিত হয় দেবজ্যোতি। উভয়কে বাঁচানোর চেষ্টা করে সে। হঠাৎ অমলের একজন সঙ্গী সুদীপ এসে গুলি করলে সেটা অমলের বন্ধুর গায়ে লাগে। অমল আর সুদীপ পালায়। কিংকর্তব্যবিমূঢ় দেবজ্যোতিও ফেরার হয়। সেই আঁধার নামা ভোর বেলাটার কথা কোনদিনই ভুলতে পারবে না আনন্দী। সময়টা প্রায় সাড়ে সাতটা। চায়ের টেবিলে মা, বাবা, বোন আর আনন্দী বসেছিল। পাশের বাড়ি থেকে কানে আসছিল খুড়তুতো ভাইয়ের পড়ার শব্দ। হঠাৎ দরজায় কড়ার আওয়াজ শুনে দরজা খুলে দিল বোন, চোখ ফেরাতেই বিপিনদাকে দেখল আনন্দী। বিস্ময়ের অন্ত রইলনা তার। উত্তেজিত আনন্দী বলল, ‘দাদা তুমি এখন?’ ‘তোর সাথে খুব জরুরী কথা আছে?’ আনন্দী বলল, ‘হ্যাঁ তবে ঘরে চলো’। বিপিনের মুখে সব শুনে আনন্দীর মুখ দিয়ে একটাও শব্দ বের হলো না।

নিস্তব্ধতা গ্রাস করে নিল সারা ঘরটাকে। কিছুক্ষণ পর নীরবতা ভেঙ্গে বিপিন বলে উঠল ‘চুপ করে থাকিস না, কিছু বল। ‘শোন বিপিনদা আমি অন্তর থেকে মানি যে দেবজ্যোতি নির্দোষ। প্রশ্নটা অন্য জায়গায়, ও পালাতে গেল কেন? ও যদি থানায় গিয়ে সব কথা বলে দিত তাহলে ব্যাপার এত জটিল হত না দাদা’। ‘একদম ঠিক বলেছিস, আমি ওর বাড়িতে খবর দিয়েছি। দেবজ্যোতির বাবা আসবেন। শোন আনন্দী আমি এখন যাই। অনেক কাজ আছে। টিউশন পড়াতে হবে’। এই বলে বেরিয়ে গেল বিপিন। আশঙ্কা আর উদ্বেগে কেটে গেল দিনটা। পরদিন সন্ধ্যাবেলা, মা, বাবা আর বোনের সাথে বসেছিল আনন্দী। ‘মন খারাপ করিস না দিদি। সব ঠিক হয়ে যাবে’। আনন্দীর মা বললেন, ‘কেউ সদর দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে না রে’? কানে এল, ‘দরজাটা খুলুন’। ধড়ফড় করে গিয়ে দরজা খুলে দিলেন আনন্দীর মা। একজন পুলিশের পোশাক পরিহিত ভদ্রলোক বললেন, ‘ম্যাডাম এখানে আনন্দী পাল চৌধুরী থাকেন? আপনি ওনার কে? আমরা থানা থেকে আসছি। আনন্দীকে আমাদের Investigate করতে হবে’। ‘আমি ওর মা। আমার মেয়েকে কেন দরকার আপনাদের?’ আরেকজন কড়া গলায় বললেন, ‘ডাকুন। ওনাকেই বলা হবে’। ততক্ষণে আনন্দীর বাবা শ্যামল বাবু আর বোন অপর্ণা ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে। শ্যামলবাবু বললেন, ‘যা বলার আমাকে বলুন। ওর সাথে এমন কোনো কথা থাকার কথা না যেটা আমাদের বলা যায় না।’ ‘আমি আনন্দী পাল চৌধুরী, বলুন, আনন্দীর কথা শেষ হতেই একজন বললেন, ‘দেবজ্যোতি গোস্বামীকে চেনেন?’ এই প্রশ্ন শুনেই খানিকটা থতমত খেয়ে আনন্দী জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, আমার বন্ধু’। একজন উর্দিধারী ভদ্রলোক বললেন, ‘শুধু তো বন্ধু নয়, আমাদের কাছে খবর আছে। একটা ছেলে খুন হয়েছে, কয়েকজনের সাথে ও পালিয়েছে। ‘আপনি জানেন কিছু? কোথায় গেছে?’ আনন্দী বলল, ‘না’। ‘থানায় চলুন ইনভেষ্টিগেশন করা হবে’। আনন্দীর বাবা-মার প্রতিবাদ অগ্রাহ্য করে তারা আনন্দীকে থানায় নিয়ে গেল। সেটা ছিল আনন্দীর জীবনে সবচেয়ে অন্ধকারময় রাত। মানুষ যে কতটা মানবিকতা শূন্য হয়ে যেতে পারে সেটা সেদিন হাড়ে হাড়ে বুঝেছিল সে। প্রথমে দুটো একটা কথা জিজ্ঞাসা করার পর কয়েকজন মহিলা পুলিশ যা তার ওপর করেছিল আজ সে কথা ভাবলে তার শরীরে বয়ে যায় আতঙ্কের হিমেল স্রোত। তখন আনন্দীর ঋতুস্রাব চলছিল। কথা বার করার অজুহাতে লাঠি দিয়ে তারা মারতে থাকে। সে স্মৃতি এত বছর পরেও আনন্দীর পিছু ছাড়েনি, নিজের জীবনে এই তিক্ত ভয়ংকর অভিজ্ঞতা হওয়ার আগে সে বইয়ের পাতায় পড়েছিল। তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী কমরেড ইলা মিত্রের জীবনের কথা। স্বীকারোক্তি আদায়ের নামে থানায় ওনার ওপর অকথ্য অত্যাচার চালানো হয়। আনন্দীর যখন জ্ঞান ফেরে তখন সে হসপিটালে। মাথার কাছে জলভরা চোখে দাঁড়িয়ে ছিলেন বাবা। সারা শরীরে অসম্ভব ব্যথা। ডাক্তারবাবু হঠাৎ বাবাকে ডেকে বললেন, ‘এমনিতে, তেমন কিছু হবে না। একটা আশঙ্কা তো রয়েই যায়!’ আনন্দীর বাবা উত্তেজিত হয়ে বললেন, ‘আশঙ্কা? ডাক্তারবাবু, আমাকে খুলে বলুন’। পলক পড়তে না পড়তেই ডাক্তারবাবু বললেন, ‘আসলে মেয়েটা এত মার খেয়েছে যে ভবিষ্যতে এর ফল ভাল নাও হতে পারে। ইফিউচার, সন্তান জন্ম দেবার ক্ষেত্রে কিছু কমপ্লিকেশনস্ দেখা দিতে পারে’।

তারপর আনন্দীর জীবনে অতিবাহিত হয়েছে বেশ কিছু বছর, বাবা-মার অনেক অনুরোধ সত্ত্বেও অন্যত্র বিয়ে সে করেনি, আত্মীয় স্বজন বহু বিরূপ আচরণ করেছে তার সঙ্গে। নিজের মামা, মাসিরাও কুৎসা রটাতে ছাড়েনি। তবু, আনন্দী দেবজ্যোতিকে ভুলতে পারে নি। সংগ্রাম চালিয়েছে সে। বি.এড. করে এস.এস.সি. দিয়ে চাকুরী নিয়েছে সে। মন জুড়ে আজও বেঁচে আছে দেবজ্যোতির স্মৃতি। কোনো দোষ না করে প্রমাণের অভাবে দেবজ্যোতির কারাবাসটাকে সে মন থেকে কোনদিন মানতে পারেনি। যন্ত্রণা কুরে কুরে খুয়েছে তাকে। নিজের ভালোবাসাকে একা বুকের মধ্যে লালন পালন করে বাঁচা একটা মেয়ের পক্ষে যে কতটা কঠিন সেটা সেই জানে। নিঃসঙ্গতা কে মূলধন করে কেটে গেছে জীবনের এতগুলো বছর।

অতীতের কথা গুলো ভাবতে ভাবতে কখন যে সন্ধ্যা পার হয়ে রাত হাজির হয়েছে সে বুঝতেও পারেনি। আজ আকাশটা খুব পরিষ্কার। তারা গুলো একা একা জ্বলজ্বল করছে। ছাদ আর বাগান থেকে চাঁপা ফুলের একটা গন্ধ আসছে।

‘তিথি, এখানে দাঁড়িয়ে আছিস? তোকে আমরা খুঁজছি। চল নীচে’।

– ‘যাচ্ছি মা। দেবজ্যোতি ছাড়া পাবে শুনলাম বিপিনদার থেকে’। মায়ের চোখে মুখে চিক্চিক্ করে উঠল হাসি। শত মতবিরোধ থাকলেও মায়ের মত বন্ধু তাদের দুই বোনের আর কেউ নেই। ‘চল মা’-এই বলে মা আর মেয়ে নীচে নেমে গেল।

জেল থেকে ছাড়া পাবার পর দেবজ্যোতি নিজের বাড়ি চলে গেল। অনেক দিন কোন খবর নেই। বিপিনদার থেকে ফোন নম্বর নিয়ে অনেকবার চেষ্টা করেছে সে। বারবার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। একটা রবিবার সকালবেলা হঠাৎ বাড়ি আসে বিপিনদা। ছুটির সকালটা আনন্দী সাধারণত পড়াশোনা করে। বোন এসে বলে, ‘দিদি বিপিনদা এসেছে’।

আনন্দী সঙ্গে সঙ্গে নীচে নেমে যায়। বিপিনদার চোখ মুখ থমথমে দেখে সে বলল, ‘তুমি এত উদ্বিগ্ন কেন? তুমি নর্থবেঙ্গল গিয়েছিলে? দেখা হয়েছে দেবজ্যোতির সঙ্গে? কথা হলো? আমাকে ফোন করেনি, ফোন বন্ধ? বলো, বলো প্লিজ, চিন্তা হচ্ছে।’ ‘তুই আর ব্যাপারটা নিয়ে ভাবিসনা আনন্দী’, এই বলে বিপিনদা একটা চিঠি নিজের পকেট থেকে বের করে আনন্দীর হাতে দিল। অবাক চোখে আনন্দী বলল, ‘চিঠি কার?’ বিপিন বলল, ‘পড়, দেবজ্যোতির চিঠি’। চিঠিটা খুলেই আনন্দী পড়তে লাগল,

প্রিয় আনন্দী,

আশা করি ভালো আছিস। জানি তুই আমাকে কোনোদিন ক্ষমা করতে পারবিনা। আমার জন্য তোকে সহ্য করতে হয়েছে নিদারুণ যন্ত্রণা, বিপিনদা আর অন্যান্যদের মুখে সব শুনেছি। নিজের আত্মগ্লানি, অপারগতা আমাকে এই কয়েক বছরে তোর থেকে যোজন মাইল আলাদা করেছে। আমার জন্য তোর জীবনের এতগুলো মূল্যবান বছর নষ্ট হয়েছে। তোর কাছে গিয়ে দাঁড়ানোর সাহসটা আজ হারিয়ে ফেলেছি। অপরাধবোধ আমাকে গিলে খায়। তোর অপেক্ষা, সংগ্রামের যোগ্য আমি নই। জীবনের মোড় আমাকে হারিয়ে দিয়েছে। পৃথক করেছে তোর থেকে। প্রথম জীবনের প্রেমের উত্তাপ আমি আর অনুভব করি না। সময় ফিকে করেছে ভালোবাসার রঙকে। যতদিন এগিয়েছে আমি সরে গেছি অতীত থেকে। জেলের খুপরি গুলো হয়তো আগের আমিকে মেরে ফেলেছে গলা টিপে। এই মৃত প্রায় ‘দেবজ্যোতি’ সমাজ পরিবার সবার কাছে ঘাড়ের বোঝা ছাড়া কিছু না। আমি চাইনা তোর জীবনকে আর বিধ্বস্ত করতে চাইনা। ভালো থাকিস।

দেবজ্যোতি।

চিঠিটা পড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আনন্দী বলল, ‘জীবনে সব যে ব্যর্থ হয়ে যাবে বুঝিনি। সব ভুল, সব ভুল, বিশ্বাস, সংগ্রাম, টিকে থাকার লড়াই। এভাবে হারিয়ে দিল ও আমাকে বিপিনদা। আসলে পুরুষতন্ত্রের জাল ওকেও আচ্ছন্ন ঘিরে ধরেছে। আমাকে নিয়ে ওর তো লাভ নেই বিপিনদা, ঠিক করেছে। আমার পাশে কারুর থাকার দরকার নেই। আমি আমার। আমি আমার নিজের বৈভবে বাঁচব। একাকীত্ব আমার দূর্বলতা নয়, এটা আমার পরম সম্পদ দাদা।’

একটা হালকা রোদের আভা ছড়িয়ে পড়েছে সারা বারান্দাতে, পাশের বাড়ির পুকুরে ঝুপ করে জলে চুমু খেল একটা মাছরাঙা। একটা ফিঙে পাখি ডেকে ডেকে ছুটে বেড়াচ্ছে এ ডাল থেকে ও ডালে। বিচ্ছেদের যন্ত্রণা তাকেও হয়তো তাড়া করে বেড়াচ্ছে। মাতৃজঠর থেকে জীবনের শেষ নিঃশ্বাসটুকু ফেলা পর্যন্ত সবাই একা।

Scroll to Top